যবিপ্রবি গবেষকদের নতুন ন্যানো ফার্টিলাইজার ও ফিশ ফিড উদ্ভাবন

28
যবিপ্রবি প্রতিনিধি
কৃষিকাজে ব্যবহৃত গতানুগতিক সারের বিকল্প  ন্যানো সার এবং মৎস্য চাষে ব্যবহৃত বাজারের গতানুগতিক খাবারের বিকল্প ন্যানো খাবার উদ্ভাবন করে সফলতা পেয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একদল গবেষক।
কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হাসান খান ও তাঁর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং যবিপ্রবির নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ল্যাবরেটরি অব ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণাগারে ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত এ  সার ও মাছের খাবার মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারেও সাফল্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন এই গবেষক দল।
ন্যানো সার ব্যবহারে বেশ কিছু সবজি চাষ যেমন ঢেঁড়স, মরিচ, লেটুস, বেগুন এবং বহুল পরিচিত তেলাপিয়া মাছ সহ কিছু কার্প জাতীয় মাছ ন্যানো খাবারের ব্যবহারে তাদের এই গবষণায় সফলতা এনে দিয়েছে।
প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. জাভেদ হাসান খান জানান, কৃষি ও মৎস্য ক্ষেত্রে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জন্য এক নতুন উদ্ভাবন যা আমাদের কৃষি ও মৎস্য শিল্পে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। ন্যানো সার সম্পর্কে তিনি বলেন, বাজারের গতানুগতিক ব্যবহৃত ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট, মিউরেট অব পটাশসহ যেসব সার কৃষকেরা জমিতে ব্যবহার করেন তার মূল সমস্যা হচ্ছে জমিতে অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ। যার ফলে পরিবেশের মাটি ও পানির দূষণ ঘটছে। অধিক ফলনের আশায় প্রয়াজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ রাসায়নিক সার প্রয়াগের ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে, সেই সাথে বৃষ্টির পানিতে অতিরিক্ত সার বৃষ্টির পানির সাথে জলাশয়ের পানিতে মিশে পানি দূষণ ঘটায়। রাসায়নিক সারের পরিবেশগত এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দিবে ন্যানো সার। আমাদের এই ন্যানো সার খুবই সামান্য মাত্রায় ফসলের জমিতে প্রয়োগ করলে অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল পাওয়া যাবে। ঢেঁড়স, মরিচ, লেটুস, বেগুন খুব কম পরিমাণ সার (যা বাজারের রাসায়নিক সারের তুলনায় খুবই কম প্রায় একশত ভাগের এক ভাগ) প্রয়োগ করলেই সমপরিমাণ অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল উৎপাদন সম্ভব।
যবিপ্রবির গবেষণাগারে উদ্ভাবিত এই ন্যানো সার মূলত উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও খনিজ উপাদানসমূহ যেমন লৌহ, জিংক ,খনিজ লবনসহ উদ্ভিদের জন্য অতি প্রয়াজনীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে যা উদ্ভিদের গ্রহন করার পর অতিরিক্ত পরিমাণ থাকলে সেগুলো যদি পানিতে গিয়েও মিশে তাহলেও পানির উপর কোন প্রভাব ফেলবে না বরং এগুলা জলাশয়ের পানিতে মিশে মাছের সম্পূরক খাদ্য হিসেবে কাজ করবে। আর ন্যানো সার প্রয়াগ করা উদ্ভিদের মধ্যে মানবদেহের সুস্থতার  জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে।
ন্যানো সারের কণাগুলো অতি শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র  দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সারের কেন্দ্রে রয়েছে প্রয়াজনীয় পুষ্টি উপাদান এবং চারপাশ ঘিরে রয়েছে  প্রয়োজনীয় খনিজ অণু। মাঠ পর্যায়ে মরিচ গাছে ন্যানো সার প্রয়াগ করে উৎপাদিত মরিচের গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ন্যানো সার গাছের দৃঢতা বৃদ্ধি করে যার ফলে গাছের দৃঢতা অনেক বেশি হওয়ায় ঝড় বা বাতাসে নুইয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। তা ছাড়া স্ট্রবেরিতেও ন্যানো সার প্রয়োগ করে গবেষণায়  চলমান বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবষক।
মাছের ন্যানো পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার সম্পর্কে ড.মো. জাভেদ হাসান খান জানান, বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে মাছের যেসব খাবার মূলত ট্যানারি শিল্পে, হাস মুরগির বিষ্ঠা ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা হয় যাতে মাছের শারীরিক কাঠামো বৃদ্ধি হলেও আমাদের খাদ্যে শিকলে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন লেড, মার্কারি, ক্রমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি মাছের উচ্চ ফলনের আশায় অধিক পরিমাণ খাবার খাওয়ানোর ফলে মাছের গায়ে বিভিন্ন ধরনের ক্ষত, দাগ ও শরীরের আকৃতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যার অন্যতম কারন হলো জেনেটিক বিশৃঙ্খলা। অতিরিক্ত পরিমাণ খাবার খাওয়ানোর ফলে দেহে প্রয়াজনের চেয়েও অধিক পরিমান আমিষ জমা হচ্ছে যা আমাদের শরীরে প্রবেশের পর আমাদের শারীরিক পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট করছে। আশা করা যায় উদ্ভাবিত ন্যানো ফিশ ফিড উল্লেখিত সমস্যাগুলো থেকে পরিত্রাণ দিবে এমনকি মাছ থেকে মানুষ অতি প্রয়াজনীয় পুষ্টি উপাদানও পাবে।
প্রকল্পের পরিচালক শিক্ষক ও গবষক ড. মো. জাভেদ হাসান খান আরও জানান, মাছের ন্যানো খাবার ও উদ্ভিদের ন্যানো সার আমরা মাঠ পর্যায়ে যদি ছড়িয়ে দিতে পারি তাহলে  মাটি ও পানি দূষণও যেমন কম হবে, তেমনি খাদ্যে গ্রহণের ফলে মানুষ যেসব জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয় তার থেকেও উপশম পাবে। তাছাড়া তিনি আরও জানান,  বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো আনোয়ার হোসেন একজন বিশ্বমানের গবেষক মানুষ হওয়ায় তার অনুপ্রেরণা ও সহযোগীতায় আমাদের ন্যানো পর্যায়ের এই গবেষণা এগিয়ে গেছে।
SHARE

LEAVE A REPLY